Menu

ডাকসু’র ভোট আজ

সাতমাথা অনলাইন ডেস্ক:  স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন হয়েছে সাত বার। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। এরপর নানা কারণে বন্ধ ছিল এই নির্বাচন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর গত ২৮ বছরে শুধু ডাকসু নয়, কোনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনই হয়নি। দীর্ঘদিন পর আজ সোমবার (১১ মার্চ) হচ্ছে বহুল কাঙ্খিত ডাকসু নির্বাচন।

দুই যুগ ধরে ডাকসু নির্বাচন না হওয়ায় এ নিয়ে ২০১২ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন ২৫ শিক্ষার্থী। আদালত তখন রুল জারি করে জানতে চান, ডাকসু নির্বাচন করার ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। সেই রুলের নিষ্পত্তি করে গত বছরের ১৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট রায় দেন; যাতে ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়। আর ওই নির্বাচনের সময় যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তার দরকার হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সে বিষয়ে যথাযথ সহযোগিতা দিতেও বলেন আদালত।

এরপর ডাকসু নির্বাচন নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। নানা জল্পনাকল্পনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন আজ সোমবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের গঠনতন্ত্রের ৮(ই) ধারা অনুযায়ী ডাকসু’র সভাপতি হিসেবে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান নির্বাচনের এই তারিখ ও সময় নির্ধারণ করেন।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি ডাকসুর নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক এস এম মাহফুজুর রহমান। তিনি জানান, ডাকসু নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকা ২০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা হবে। ডাকসু নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৬ ফেব্রুয়ারি। এ ছাড়া, ২ মার্চ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা যাবে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ডাকসু নির্বাচনের প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হবে। মার্চের ৩ তারিখ প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। ১১ মার্চ সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে।

চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয় গত ৩ মার্চ। এরপর আচরণবিধি অনুযায়ী প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামেন। নির্বাচনের ২৪ ঘণ্টা আগে প্রচারণা শেষ করার নিয়ম, সে অনুযায়ী ১০ মার্চ সকাল ৮টায় প্রচারণা শেষ হয়।

এবারের ডাকসু নির্বাচনে মোট ভোটার ৪২ হাজার ৯২৩ জন। নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা অনুসারে ডাকসুর ২৫টি পদের বিপরীতে লড়বেন ২২৯ জন প্রার্থী। এর মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে ২১ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৪ এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ১৩ প্রার্থী। এ ছাড়া, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক পদে ১১ জন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ৯ জন, কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ৯ জন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে ১১ জন, সাহিত্য সম্পাদক পদে ৮ জন, সংস্কৃতি সম্পাদক পদে ১২ জন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১১ জন, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে ১০ জন ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে ১৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এর বাইরে ১৩টি সদস্য পদের বিপরীতে লড়বেন ৮৬ প্রার্থী। এবারের নির্বাচনে একেক জন ভোটারকে দিতে হবে ৩৮টি ভোট।

যে পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করা হবে

৬ মার্চ প্রভোস্ট কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে মেটাল ডিটেক্টর ও আর্চওয়ে স্থাপন করা হবে। শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড দেখিয়ে নিজ নিজ ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। দুপুর ২টার মধ্যে যারা কেন্দ্রে প্রবেশ করবে, তাদের সবারই ভোটগ্রহণ করা হবে। অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) ফর্মে ভোটগ্রহণ করা হবে। প্রতিটি পদের জন্য আলাদাভাবে ব্যালট নম্বর ও প্রার্থীর নাম ওএমআর ফর্মে থাকবে। ভোটার নিজের আইডি কার্ড দেখিয়ে ব্যালট পেপার সংগ্রহ করে প্রার্থীর নামের ডানপাশে নির্ধারিত ঘরে ক্রস চিহ্ন দিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বুথ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা রাখা হবে। ভোট বাক্স হবে অস্বচ্ছ, স্টিলের তৈরি এবং তালাবদ্ধ। প্রতিটি বুথে একটি চেয়ার এবং একটি টেবিল থাকবে শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য। বাঁশের তৈরি এই বুথগুলো কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকবে।

ভোটারদের জন্য তথ্য

নির্বাচনের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া, ভোটের দিন যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকবে। ভোটের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নির্বাচনের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩টি প্রবেশপথ (নীলক্ষেত, শাহবাগ ও হাইকোর্ট) বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় থাকবে। এই ৩টি প্রবেশপথ দিয়ে শুধু ভোটার ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজ নিজ পরিচয়পত্র দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাওয়া-আসা করতে পারবেন। ভোট কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট পাসযুক্ত যানবাহন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত এই ৩টি গেট দিয়ে চলাচল করবে। শিক্ষার্থীদের অবাধ চলাচল ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ও স্টিকারযুক্ত যানবাহন ছাড়া অন্য কোনও যানবাহন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবে না। ডাকসু নির্বাচনের দিন রাত ১০টা পর্যন্ত সর্বসাধারণকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নির্দেশনা

রবিবার (১০ মার্চ) সন্ধ্যা থেকে সোমবার (১১ মার্চ) সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হলে বকশীবাজার হয়ে চানখাঁরপুল দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। শনিবার (৯ মার্চ) শাহবাগ থানায় এক জরুরি সভা শেষে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। ডিএমপি কমিশনার জানান, নির্বাচন উপলক্ষে ক্যাম্পাসে প্রবেশের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ মানুষ ও যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘১০ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১১ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সাতটি পয়েন্টে ব্যারিকেড দিয়ে চেকপোস্ট করে তল্লাশি করবে পুলিশ। শাহবাগ, নীলক্ষেত, শহীদুল্লাহ্ হল ক্রসিং, রোমানা ক্রসিং, পলাশী, দোয়েল চত্বর ও জগন্নাথ হল ক্রসিংয়ে এসব চেকপোস্ট থাকবে।’

এসময় ঢাবির শিক্ষক, কর্মচারী, শিক্ষার্থীদের প্রবেশের জন্য আগে থেকে পাস সংগ্রহের অনুরোধ জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, স্টিকার ছাড়া কোনও গাড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে না। এমনকি, নির্বাচনের দিন কোনও রিকশা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবে না। ভেতরে কিছু রিকশা থাকবে, সেগুলো চলাচল করবে।

গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নির্দেশনা

শুক্রবার (৮ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতর থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নির্বাচনের দিন গণমাধ্যমকর্মীরা চিফ রিটার্নিং অফিসারের ইস্যু করা পরিচয়পত্র দেখিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট হলের রিটার্নিং অফিসারের অনুমতি সাপেক্ষে ভোটকেন্দ্রের গেস্টরুম/নির্ধারিত স্থান পর্যন্ত যেতে পারবেন। তবে ভোটকেন্দ্র থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা যাবে না। ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোনসহ সব ধরনের ইলেট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্য এবং প্রিন্ট ও পাস পাওয়া সাপেক্ষে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নির্ধারিত সংখ্যক প্রতিনিধি ভোটকেন্দ্রের নির্ধারিত জায়গায় উপস্থিত থাকতে পারবেন। আবেদন সাপেক্ষে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য সর্বোচ্চ ৪টি ক্যামেরা ইউনিটকে এবং প্রতিটি প্রিন্ট মিডিয়ার সর্বাধিক ২ জন সাংবাদিককে পরিচয়পত্র দেওয়া হবে।

ভবিষ্যতে সুষ্ঠু ও নিখাদ ব্যবস্থাপনায় ডাকসু নির্বাচন পরিচালনার পথ তৈরি হলো উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড আখতারুজ্জামান বলেন, এ দাবি করা তুলনামূলক কঠিন যে, নির্বাচনের সব কর্মযজ্ঞ ও আয়োজন একেবারেই ত্রুটিমুক্ত, নিখুঁত। অনিচ্ছাকৃত বিভিন্ন ভুল-ত্রুটি হয়তো রয়েছে। তবে এতটুকু জোর দিয়ে বলা যায় যে, চিফ রিটানিং অফিসার ও তার টিম, হলসমূহের প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষক, আমাদের সহকর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রম ও আন্তরিকতায় কোনও ঘাটতি নেই।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছর পর এ ধরনের গুরুত্ববহ বিশাল কর্মযজ্ঞের আয়োজন করতে পদে পদে আমাদের বিভিন্ন বিষয় নতুন করে ভাবতে হয়েছে, সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ে। গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধিসহ সবকিছুতেই সময়ের চাহিদা বিবেচনায় রাখতে হয়েছে নতুন করে। প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজ তৈরি হয়েছে; এর সুফল প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে গভীরভাবে অনুভূত হবে। এ মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শতাধিক সম্মানিত সহকর্মী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় দক্ষ জনবল হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলেছেন। তাই ভবিষ্যতে আরও সুষ্ঠু ও নিখাদ ব্যবস্থাপনায় ডাকসু নির্বাচন পরিচালিত হওয়ার পথ তৈরি হলো –একথা দৃঢ়ভাবে বলা যায়।

বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন।

No comments

Leave a Reply

four × two =

সম্পাদকীয়

    উপ-সস্পাদকীয়

    সংবাদ আর্কাইভ

    সংবাদ